শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:২৮ অপরাহ্ন

শীত এসেছে, তাদের ব্যস্ততাও বেড়েছে

শীত এসেছে, তাদের ব্যস্ততাও বেড়েছে

অল নিউজ ডেস্ক :

=
পাখির কিচির-মিচির ডাকে ভোর হয় গ্রামীণ জনপদে। শিশির ভেজা ঘাস আর ঘন কুয়াশা জানান দিচ্ছে শীত এসে গেছে। পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ, সেই সঙ্গে খেজুরগাছের সারি; দেখে মন কাড়বে যে কারও।

শীতের আবহে সবকিছু যেন বদলে যেতে শুরু করেছে। খেজুরের রস, গুড়, পায়েস ও পিঠা না হলে যেন শীত জমেই না। তাই শীতের মৌসুম শুরু হতে না হতেই খেজুরের রস আহরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার গাছিরা।

 

সূর্যোদয়ের আগেই গাছিরা ধারাল দা, কোমরে দড়ি, ঠোঙা-দড়া (গাছ কাটার সরঞ্জাম) নিয়ে ছুটতে থাকেন মাঠের দিকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তাদের ব্যস্ততা।

 

এ কাজে হাতের নৈপুণ্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন কায়িক পরিশ্রম। এ কারণে এ পথে পা বাড়াচ্ছে না নতুন প্রজন্ম। দিন দিন কমছে গাছির সংখ্যা।  ৩৫ বছর ধরে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন স্থানীয় গাছি মো. আব্দুল করিম। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘বয়সের ভারে আগের চেয়ে গাছ কাটা এখন কমে গেছে। দিনে ১৫টা করে গাছ কাটতে পারি। গাছপ্রতি ১০০ টাকা করে পাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখনকার তরুণরা গাছ কাটা-বান্দা পারে না। তাই আমাদেরই করতে হয়। সরকারের কাছে দাবি, আমাদের যেন একটা ব্যবস্থা করে।’ বয়সের ভারে গাছ কাটা এখন কমে গেছে। দিনে ১৫টা করে গাছ কাটতে পারি। গাছপ্রতি ১০০ টাকা করে পাই। এখনকার তরুণরা গাছ কাটা-বান্দা পারে না। তাই আমাদেরই করতে হয়। সরকারের কাছে দাবি, আমাদের যেন একটা ব্যবস্থা করেস্থানীয় গাছি মো. আব্দুল করিম।

আব্দুল মুজিত নামের আরেক গাছি বলেন, আমরা এখন অন্যদের গাছ কাটি। সারাদিন গাছ কেটে যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। এখন শেখার মতো লোকও নাই। আমরা যখন থাকব না তখন এ ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।

 

এ কাজে হাতের নৈপুণ্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন কায়িক পরিশ্রম। এ কারণে এ পথে পা বাড়াচ্ছে না নতুন প্রজন্ম। দিন দিন কমছে গাছির সংখ্যা। কালের বিবর্তনে যশোরের এ ঐতিহ্য অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে, অভিমত স্থানীয়দের।

রহমত আলী নামের স্থানীয় এক কৃষক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে খেজুরগাছের ব্যবহার অনেক বেশি। এ কারণে গাছের সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে।’ স্থানীয় তরুণরা কেউ এ পেশায় আসেন না। তাই যশোরের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও গুড় নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন গাছি আব্দুল করিম / ছবি- ঢাকা পোস্ট
স্থানীয় তরুণরা কেন এ পেশায় আসছেন না— জানতে চাইলে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দেওয়া সোহান হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, দাদার কাছে শুনেছি আমাদের প্রায় একশ’র বেশি গাছ ছিল। দাদার পর বাবা কিছুদিন গাছ কেটে রস সংগ্রহ করতেন। কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে পরে আমরা আর গাছ কাটা শিখিনি। এ কারণে গাছগুলোও আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

গাছ থাকলেও বর্তমানে গাছি পাওয়া দুষ্কর। এ কারণে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে যশোরের যশ খেজুরের রসের
সমরেন বিশ্বাস, চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তরুণরা কেন এ পেশায় আসেন না, তার ব্যাখ্যা দিলেন স্থানীয় যুবক সোহান হোসেন। স্বাদে ভিন্ন আর মানে অনন্য হওয়ায় যশোরের খেজুরগুড়ের কদর দেশজুড়ে। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও চৌগাছায় ২০ হাজারের মতো খেজুরগাছ প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব গাছ থেকে ৫০-৬০ হাজার টন গুড় উৎপাদন হবে বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সমরেন বিশ্বাস। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘যশোরের এ উপজেলায় ৩০ হাজারের মতো খেজুরের গাছ রয়েছে। কিছুদিন আগেও শেখ রাসেল দিবস উপলক্ষে বাছাই করা ১০০টি খেজুরগাছের চারা বিভিন্ন স্কুলে বিতরণ করেছি। গাছ থাকলেও বর্তমানে গাছি পাওয়া দুষ্কর। ঐতিহ্য হারাতে বসেছে যশোরের যশ খেজুরের রসের।’

কীভাবে এটি ধরে রাখা সম্ভব— জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে কাজ করলে যশোরের খেজুরের রসের যে ঐতিহ্য সেটি আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এ লক্ষ্যে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

এদিকে, উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে খেজুরের গুড় রফতানি করা সম্ভব বলে মনে করছে স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আছাদুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে আমরা ঐতিহ্য-বিমুখ হয়ে পড়ছি। বিভিন্ন টেকনিক্যাল কারণেও আমরা পিছিয়ে পড়ছি।’

 

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে গাছ কাটার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারলে এবং উন্নত ব্যবস্থাপনায় গুড় বাজারজাত করা গেলে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও যশোরের খেজুরের গুড় রফতানি করা সম্ভব আছাদুল হক, চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা
‘আমার যখন চৌগাছায় পদায়ন হয় তখনই ঠিক করি যে যশোরের ঐতিহ্যবাহী গুড়-পাটালি গুড় নিয়ে কাজ করব। কয়েকটি বিষয়ও সামনে নিয়ে আসি। যেমন- রস সংগ্রহের সুবিধার্থে গাছের আকার ছোট করা, রসের পরিমাণ বাড়ানো, জ্বালানি খরচ কমানো, রসের মধ্যে গুড়ের উপাদান বাড়ানো, উন্নত প্রযুক্তিতে গাছ কাটার ব্যবস্থা করা প্রভৃতি।’

আছাদুল হকের ভাষায়, ‘যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে গাছ কাটার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারলে এবং উন্নত ব্যবস্থাপনায় গুড় বাজারজাত করা গেলে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও যশোরের খেজুরের গুড় রফতানি করা সম্ভব।’

স্থানীয়রাও জানান, কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসা যশোরের এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।

শেয়ার করুন .....




© 2018 allnewsagency.com      তত্ত্বাবধানে - মোহা: মনিকুল মশিহুর সজীব
Design & Developed BY ThemesBazar.Com