সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১০:২৩ অপরাহ্ন

ছোট্ট শিশুর না বলা অনুভূতি 

ছোট্ট শিশুর না বলা অনুভূতি 

কলমে- তমা কর্মকার :

আমার নাম অক্ষর,আমার বয়স নয়মাস, আমি হাটতে পারিনা, নিজে হাতে খেতেও শিখিনি কিছু,আমি এখনো কথা বলতে শিখিনি,জানিনা কোনটা ভালো কোনটা খারাপ| আমি বড়োদের মতো মেকি হাসতেও জানিনা,আমার দাঁত ওঠেনি এখনো আমি ফোকলা গালে হাসি প্রাণ খোলা হাসি, আর যখন আমি কাঁদি তখন সবাই আমায় থামাতে ব্যস্ত হয়ে পরে, তবে এমনিতে আমি ভীষণ শান্ত একটুও দুস্টুমি করিনা শুধু ঠাম্মির মেমেন্টো মেডেল নিয়ে গলায় উত্তরীয় পরে শান্ত হয়ে বসে থাকি ।

আমাকে পাশে বসিয়ে ঠাম্মি যেন একমনে কিসব লিখে চলে আমি কিছু বুঝিনা।

এমনি করেই আমার দুপুর কাটে মাঝে মাঝে মায়ের কাছে ঘুমাতে যাই তারপর বিকেল হলে সেজে গুজে ঠাম্মির সাথে বেড়াতে যাই আমাদের বাড়ীর পিছনে সবুজে ঘেরা খেলার মাঠে ওখানে আমি আর ঠাম্মি দুর থেকে বসে দেখি সব দাদাভাইরা খেলা করে আমি ও বায়না করি খেলার জন্য ঠাম্মি বলে সাহেব আরেকটু বড়ো হও তারপর খেলবে ।

আমি ও ঠাম্মি অগত্যা মাঠে বসে থাকি তবে ম্যাক্স পরে ঠাম্মির সাথে সাথে আমিও ম্যাক্স পরি,কি বলে একটা ভাইরাস রোগ এসেছে তার জন্য, প্রথম প্রথম আমি ম্যাক্স পড়তে না চাইলেও এখন পরি।

অনেক কথা হলো বাপু এবার আসি তোমার সাথে আমার পরিচয়ের প্রথম দিনের কথায়, |

দিনটা ছিলো পঁচিশে বৈশাখ আমি বিকাল বেলা মায়ের কাছ থেকে ঘুম থেকে উঠে ঠাম্মির কাছে আসতে গিয়ে দেখলাম ঠাম্মি সাদা রঙের শাড়ি পড়ে সেজে গুজে সামনে একটা বাটিতে অনেকগুলি বকুল ফুল নিয়ে বসে আছে আমি তো মহা আনন্দে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম ঠাম্মির কোলে, ভাবলাম ঠাম্মি মনে হয় অন্য দিনের মতো আমাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে ও হরি দেখি তোমার ছবিতে রজনীগন্ধার মালা চন্দন দিয়ে সাজিয়ে তোমাকে সামনে বসিয়ে এক নাগাড়ে অনর্গল কথা বলেই চলেছে, আমি কাঁদো কাঁদো রবে বায়না করতেই মা বলল চুপ করে বসে শোনো ঠাম্মি কবিতা আবৃত্তি করছে |

কিন্তু কে শোনে কার কথা আমি কি ছাই আবৃত্তি কি বুঝি?আমি তো আমার স্বভাব সিদ্ধ সরলতায় হামাগুড়ি দিয়ে তোমার ছবিটা ধরতে যেতেই ঠাম্মি আবৃত্তি থামিয়ে বলল দাদা কে ধরেনা ভাই দাদা রাগ করবে|শিশু হলেও বুঝলাম তুমি আমার সম্পর্কে দাদা হও , তবে এটা বুঝলাম না তোমাকে আমি ধরলে তুমি রাগ করবে কেনো? আমি তো দাদান কে ধরি দাদান তো রাগ করেনা বরং আমায় কোলে নেয় আদর করে তবে তুমি রাগ করবে কেনো? মা আমাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল্ ঠাম্মি বলল থাক ওকে নিও না আমার আবৃত্তি করা হয়ে গেছে, এরপর ঠাম্মি তোমাকে প্রণাম করে দেওয়ালের হুকে টাঙিয়ে রাখলেন, আমার কিন্তু তোমাকে ধরা ও ছোঁয়ার কৌতূহল বেড়েই গেলো, কিন্তু আমি তো ছোট্ট তাই কিছুতেই তোমাকে ধরতে ও ছুঁতে পারিনা, কিন্তু সারাক্ষন মনে মনে ভাবি আচ্ছা সবাই তো আমাকে কোলে নেয় আদর করে, কিন্তু তুমি কেনো কোলে নেওনা আদর কোরোনা শুধু দেওয়ালে টাঙানো অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকো আর মায়াভরা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দৃষ্টি রাখো সবার দিকে, আমি ঠাম্মির কোলে উঠলেই তোমার কাছে গিয়ে তোমাকে ধরার জন্য বায়না করতে থাকি , একদিন ঠাম্মা হুকে টাঙানো তোমার কাছে আমাকে নিয়ে গেলো, আর তোমাকে হুক থেকে নামিয়ে আমার কাছে তোমাকে দিয়ে বলল তুমি রবি দাদার ছবি ধরবে? সেই প্রথম জানলাম তোমার নাম রবি।

আমি ঠাম্মির সাহায্যে তোমাকে প্রথম ছুলাম তোমাকে দেখার প্রথম লগ্নে শিশু মনে তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম|তোমাকে ছোঁয়ার পর এক বিদ্যুৎ খেলে গেলো আমার শরীরে।

আচ্ছা দাদা তুমি এখন কোথায়? ঠাম্মি বলে সাহেব বড়ো হও তোমাকে দাদার বাড়ি জোড়াসাঁকোতে বেড়াতে নিয়ে যাবো, আবার বলে তুমি বড়ো হও তোমায় দাদার গড়া শান্তিনিকেতনে নিয়ে যাবো ওখানে কোপাই নদী আছে আছে সোনাঝুরির হাট সেখানে নাকি বাউল মেলা বসে? অনেক পশারিরা পসার নিয়ে হাটে আসে, বিকেলের বাতাস ভরে ওঠে বাউল সংগীতে আর নানা রঙের জামা পড়ে বাউল একতারা বাজিয়ে নেচে নেচে গায় বাউল গান, সেই গান শুনতে নাকি দেশ বিদেশ অনেক লোক আসে ঐ বাউল মেলায় ?জানো দাদা ঠাম্মি আরো তুমি নাকি ঠাকুর তবুও তোমার আলাদা কোনো মন্দির নেই তুমি নাকি সবার মনমন্দিরেই বাস করো? বলোনা দাদা কেমন করে সম্ভব করলে এমন অসম্ভব কাজ? জানো দাদা ঠাম্মি বলে তুমি নাকি আমাদের জন্য অনেক ছড়ার বই গল্পের বই লিখেছো? লিখেছো গান নাটক কবিতা আমি তো ছোট্ট তাই বুঝিনা এগুলো কি তবে ঠাম্মি বলে আমিও নাকি বড়ো হয়ে তোমার লেখা সব বই পড়বো তোমার সম্পর্কে অনেক কিছু জানবো,ঠাম্মি তোমাকে নিয়ে তোমার গল্প বলে, বলে তোমার গীতাঞ্জলি সোনার তরী চিত্রাঙ্গদার কথা বলে তোমার নোবেল সহ কতো বড়ো বড়ো পুরস্কার পাওয়ার কথা, আচ্ছা দাদা রাখী বন্ধনের মতো মহামিলনের উৎসব বলে তোমার হাত ধরেই এসেছিলো? ঠাম্মি বলে তোমার নাইট উপাধি ত্যাগের কথা বলে জ্বালিয়নাবাদের আন্দোলনের কথা দাদা ঠাম্মি বলে তুমি বিশ্বকবি এক কথায় জ্ঞানের সমুদ্র |তোমার নামেই নাকি রবীন্দ্র বিশ্ব ভারতী ।

জানো দাদা ঠাম্মি আরো কথা বলে তোমাকে নিয়ে|দাদা তোমার ছাতিম তলার পাঠশালার গল্প শুনতে শুনতে আমি এখন ঘুমিয়ে পরি|তবে তোমাকে আরো জানার আরো চেনার কৌতূহল নিয়ে আমি বড়ো হচ্ছি |তুমি আমাকে আশীর্বাদ করো আমি যেন তোমাকে জানতে পারি তোমাকে চিনতে পারি। তোমাতেই আত্মনিবেদন করতে পারি ।

ঠাম্মির কাছে শোনা তোমার শান্তিনিকেতনের ছাতিম তলা, আম্র কুঞ্জে যেন ঘুরতে পারি, শাল, পিয়াল,শিমুলের, বনে যেন মুক্ত মনে যেন বিশুদ্ধ বাতাসের তালে তালে বসন্তের হোলির আবির গায়ে মেখে যেন রবীন্দ্র সংগীত শুনতে পারি|দাদা আমরা আমাদের এই প্রজন্মেও যে তোমাকে কাছে পেতে চাই তোমার আদর খেতে চাই, অমলের মতো মিনির মতো তোমাতে তোমার ছোঁয়া পেতে চাই ।অনলাইন নয় অফ লাইনে তোমাকে চাই তোমাকে যে আমাদের ভীষণ প্রয়োজন ।

দাদা একবার ছবি থেকে বেড়িয়ে এসে কি বলতে পারোনা? আয়রে নবীন আয়রে আমার কাঁচা, আমি সশরীরে না থেকেও গোলোকে থেকেও ভুলোকে ছিলাম তোদের মাঝে, সশরীরে আজ আবার এই ধরায় ফিরে এসেছি তোদের কাছে তোদের আবদারে| এসো দাদা আবার ফিরে ঠাম্মা দাদুর সাথে সাথে তোমার হাত ধরেও তোমার লেখা সেই গান খানি গাইতে চাই সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে ফুলও ডোরে বাঁধা ঝুলনায়,অথবা মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি।

হোক না দাদা নতুন করে আবার তোমার লেখা শাপমোচন|নয়তো অ।

 অনুরচনা -দা দা

শেয়ার করুন .....




© 2018 allnewsagency.com      তত্ত্বাবধানে - মোহা: মনিকুল মশিহুর সজীব
Design & Developed BY ThemesBazar.Com