রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০৭:২১ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
বাঘায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষে সেমিনার মন্ডপ ও মন্দিরে হামলা, ভাংচুরের প্রতিবাদে বিভিন্ন সংগঠনের মানববন্ধন চৌমুহনীতে পূজামন্ডপে হামলা, ৩ জনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন নির্বাচন : অনুমোদনহীন সদস্য অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাজশাহীতে মানববন্ধন রাজশাহী মেডিকেলে করোনা উপসর্গে আরও ২ জনের মৃত্যু শহীদ কামারুজ্জামানের সমাধিতে বিএফইউজের নয়া নেতৃবৃন্দের শ্রদ্ধা দুর্গাপুরে শিক্ষক নিয়োগে তথ্য গোপন করে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়ার অভিযোগ রাজশাহী বন বিভাগের অভিযানে ২০১টি পাখি উদ্ধার নেপালে বন্যা ও ভূমিধসে মৃত্যু ১০০ ছাড়িয়েছে
গত ৩ বছরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার চরমে পৌঁছেছে

গত ৩ বছরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার চরমে পৌঁছেছে

অল নিউজ ডেস্ক :
আগামীকাল ১ অক্টোবর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর তিন বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। গত তিন বছরে সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে এ আইনের ব্যবহার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে দেশে এবং দেশের বাইরে মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছে।

 

এ কঠোর আইন ব্যাপক হারে ব্যবহারের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সম্পাদক পরিষদ ‘দুঃস্বপ্নের বাস্তবতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আইনটি বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। সাংবাদিক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকরা ডিজিটাল মাধ্যমে মতামত প্রকাশের জন্য এ আইনের দ্বারা দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।

 

বৃহস্পতিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর তিন বছর’ উপলক্ষে এ আইনের ব্যবহারের কিছু পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে।

সিজিএস জানায়, আইনটি চালু হওয়ার পর থেকে কথিত সাইবার অপরাধ সম্পর্কিত দায়ের করা মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৩ সাল থেকে প্রাথমিকভাবে তথ্য ও যোগাযোগ আইন- এর অধীনে এবং পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে সাইবার ট্রাইব্যুনালে করা মোট মামলার সংখ্যা ৪ হাজার ৬৫৭টি। এর মধ্যে ৯২৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে ২০১৮ সালে। এক হাজার ১৮৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে ২০১৯ সালে এবং ২০২০ সালে দায়েরকরা মামলার সংখ্যা এক হাজার ১২৮টি।

সংস্থাটি জানায়, ১ জানুয়ারি ২০২০ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ সাল পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর অধীনে ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা ভিন্ন মতের বিরুদ্ধে এ কঠোর আইন ব্যবহার করেছে। বর্তমানে ডিজিটাল আইনের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে।

 

সিজিএস এর সংগৃহীত তথ্যনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর অধীনে দায়ের করা মামলাগুলো চিহ্নিত করে নথিভুক্ত করা করছে। ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির (এনইডি) অর্থায়নে এই সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের মুখ্য গবেষক হিসেবে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ।

 

সিজিএস ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর প্রভাবের কিছু পয়েন্ট তুলে ধরেছে-
১. চলতি মাসের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৬৮টি মামলার বিবরণ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। এই তথ্যাবলী সংগ্রহ করা হয়েছে সরকার অনুমোদিত প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম, অভিযুক্ত বা অভিযুক্তের পরিবার এবং তাদের নিকটজন, অভিযুক্তের আইনজীবী এবং থানা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে। এই ৬৬৮টি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১ হাজার ৫১৬ জন, যার মধ্যে ১৪২ জন সাংবাদিক, ৩৫ জন শিক্ষক, ১৯৪ জন রাজনীতিবিদ, ৬৭ জন শিক্ষার্থী। সিজিএস ৫৭১ জন মানুষের পেশা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। মোট মামলার প্রায় ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং যাদের পেশা চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের মধ্যে ২৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ ব্যক্তি সাংবাদিক।

২. যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মধ্যে সাংবাদিকদের সংখ্যা অসমভাবে বেশি। গ্রেফতার ব্যক্তিরা ৪৯৯ জনের মধ্যে ৪২ জন সাংবাদিক, ৫৫ জন রাজনীতিবিদ, ৩২ জন শিক্ষার্থী। এখন পর্যন্ত চিহ্নিত ৬৬৮টি মামলায় ১৮ বছরের কম বয়সী ১৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের সিদ্ধান্তের বিষয়ে মন্তব্য করার পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করার অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর অধীনে করা মামলায় গ্রেফতারের পর নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে গত বছরের ২০ জুন কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

৩. এ মামলাগুলোর বেশিরভাগই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দ্বারা না হয়ে দায়ের করা হয় অন্যদের দ্বারা। প্রায়ই ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা তাদের নেতাদের পক্ষ নিয়ে মামলাগুলো দায়ের করেন। অভিযোগকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করার পর দেখা যায় তাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মামলা করেছে ৭৬টি। যা কিনা মোট দায়েরকরা মামলার ২০ দশমিক ৩২ শতাংশ।

৪. আইনের অধীনে হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা চলাকালীন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানহানির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে ৭৪টি। এর মধ্যে ১৩টি মামলা দায়ের করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং ৬১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে ব্যক্তির দ্বারা। ৩৬ জন অভিযোগকারীর রাজনৈতিক পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে, যারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। মানহানির অভিযোগে সবচেয়ে বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে, মোট ১৩টি মামলা। এর আগে ২০২০ সালের জুন মাসে ১১টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যা কিনা মামলার সংখ্যার হিসাবে একমাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই অভিযোগে মোট ৪৪ জন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে দুজন জামিন পেয়েছেন।

৫. মন্ত্রীদের মানহানির অভিযোগে ৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে। যেখানে বাকি ৩৪টি মামলা দায়ের করেছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। এসব মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ১৭ জনকে, জামিন পেয়েছেন ৩ জন।

৬. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর অধীনে অভিযোগের জন্য আইনটির ধারা ২৯, ধারা ২৫, ধারা ৩৫ এবং ধারা ৩১ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রাজনীতিবিদ, পরবর্তী অবস্থানে রয়েছেন সাংবাদিকরা।

৭. বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এই মামলাগুলো অত্যন্ত ধীরগতির। এখন পর্যন্ত মাত্র ২টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। লেখক এবং সমাজকর্মী মুশতাক আহমেদ ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর অধীনে আটক অবস্থায় কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। ৩৫ জনকে অর্ন্তর্বতীকালীন জামিন দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, অভিযুক্তদের জামিন আবেদন নিম্ন আদালতে নাকচ হয়ে যায়। মুশতাক আহমেদের জামিন ছয়বার নাকচ করা হয়েছিল। তার একজন সহ-অভিযুক্ত আহমেদ কবির কিশোরের জামিন নিম্ন আদালতে অন্তত ছয়বার নাকচ হওয়ার পর ২০২১ সালের মার্চ মাসে তাকে অন্তর্র্বতীকালীন জামিন দেওয়া হয়।

৮. এমন অভিযোগ আছে যে সাদা কাপড় পরিহিত পুলিশ এবং র‌্যাব সদস্যরা তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে অনেককে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আহমেদ কবির কিশোর অভিযোগ করেন, র‌্যাবের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করার তিনদিন আগে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে এই সময়ের মধ্যে তাকে মারাত্মকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, মুশতাক আহমেদকেও হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল।

৯. আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত ১৫ দিনের সঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। যদি এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হয়, তাহলে সাইবার ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন সাপেক্ষে আরও ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়। কিন্তু গত তিন বছর ধরে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না করার পরেও অভিযুক্ত এখনও হেফাজতে আছে এবং বিচারের আগেই তারা কার্যকরভাবে শাস্তি ভোগ করছেন।

 

 

উল্লেখ্য, গ্রেফতার হওয়ার দশ মাস পর শফিকুল ইসলাম কাজলকে অভিযুক্ত করা হয়। প্রথম মামলা দায়েরের পর ৫৩ দিন ধরে কাজল নিখোঁজ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাকে সীমান্তবর্তী একটি শহর থেকে উদ্ধার করা হয় এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়। নিম্ন আদালত তার জামিন নাকচ করলে সাত মাস তাকে কারাগারে থাকতে হয়।

সিজিএস’র প্রকল্পটির মুখ্য গবেষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, এ প্রবণতা দেখাচ্ছে যে কীভাবে একটি আইন উদ্ভূত কর্তৃত্ববাদের দিকে অগ্রসরমান শাসনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটি ভিন্নমতকে অপরাধে পরিণত করছে। আইনের নির্বিচার ব্যবহার বাংলাদেশে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনটি বাতিল করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। ‍সুত্র- ঢাকা পোষ্ট

শেয়ার করুন .....




© 2018 allnewsagency.com      তত্ত্বাবধানে - মোহা: মনিকুল মশিহুর সজীব
Design & Developed BY ThemesBazar.Com