বৃহস্পতিবার, ১৭ Jun ২০২১, ১০:৪৮ অপরাহ্ন

যে কারণে সন্তানের সামনে খুন হলেন সাহিনুদ্দিন

যে কারণে সন্তানের সামনে খুন হলেন সাহিনুদ্দিন

নিউজ ডেস্ক : রাজধানীর পল্লবীতে সন্তানের সামনে বাবা সাহিনুদ্দিনকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এরপরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান আসামি সাবেক এমপি এম এ আউয়ালকে আজ গ্রেফতারের কথা জানায় র‌্যাব। গ্রেফতার করা হয়েছে প্রকাশ্যে কোপানো দুই অভিযুক্ত মো. সুমন বেপারী (৩৩) ও মো. রকি তালুকদার (২৫)।

ভাইরাল ভিডিও গ্রেফতার আসামিদের জবানবন্দি থেকে লোকহর্ষক এ হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে আভাস পাওয়া যায়। মূলত জমি নিয়ে বিরোধে খুন হন সাহিনুদ্দিন।

১৬ মে বিকাল ৪ টায় জমির বিরোধের বিষয়ে মীমাংসার কথা বলে সাহিনুদ্দিনকে পল্লবী থানার ডি ব্লকের একটি গ্যারেজের ভিতর নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। সেখানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রকাশ্য দিবালকে লোমহর্ষক এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভিকটিমের মায়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ১৭ মে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা হয়।

গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আহসান খান জানান, ১৯ মে থেকে মামলার তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা মিরপুর জোনাল টিম। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় যাত্রাবাড়ী থানার রায়েরবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে হত্যার পরিকল্পনা ও নেতৃত্বদানকারী সুমনকে গ্রেফতার করা হয়। সুমনের দেওয়া তথ্য মতে পল্লবী থানার স্কুল ক্যাম্প কালাপানি এলাকা হতে অপর অভিযুক্ত রকিকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার দুজনের প্রত্যেকের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদনসহ নথি আদালতে পাঠানো হয়েছে।

এ হত্যাকান্ডের ঘটনা তদন্তকালে পল্লবী থানা পুলিশ ১৬ মে পল্লবী এলাকা হতে মো. মুরাদকে এবং ১৮ মে দিপুকে গ্রেফতার করে।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, সাবেক এমপি এমএ আউয়ালকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর মোস্তফা কামাল, সুমন বাহিনীর সুমন, তাহের, মানিক, ন্যাটা সুমনসহ বেশ কয়েকজনকে।

গত ১১ মে আকলিমা নামে এক নারী পল্লবী থানায় সুমন বাহিনীর সুমনসহ ছয়জনকে আসামি করে জিডি করেন। জিডিতে সুমন ছাড়া আরও পাঁচজনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে হ্যাভেলি প্রপার্টিজের স্বত্বাধিকারী ও সাবেক এমপি এমএ আউয়ালও আছেন। জিডিতে আকলিমা আশঙ্কা করেন, যে কোনো সময় তার ছেলে সাহিনুদ্দিনকে হত্যা করা হতে পারে। এই আশঙ্কার পাঁচ দিনের মাথায় ১৬ মে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসভাবে সাহিনুদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর মুরাদ ও টিটু নামে দুজনকে গ্রেফতার করে দুদিনের রিমান্ডে নেয় পল্লবী থানা পুলিশ। রিমান্ড শেষে আজ তাদের আদালতে হাজির করা হবে।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার দুজন হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে। তারা জানান, জমি দখলকে ঘিরে পল্লবীতে একাধিক গ্রুপ গড়ে উঠেছে। সাবেক এমপি এমএ আউয়াল এবং সাবেক মেজর মোস্তফা কামাল বড় দুটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন। এ দুগ্রুপের সদস্যদের পারস্পরিক যোগসাজশে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অথচ এ দুগ্রুপের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ রয়েছে।

দুপক্ষের সমস্যা সমাধানের কথা বলে সাহিনুদ্দিনকে বাসা থেকে ডেকে আনে মুরাদ। এ সময় সাহিনুদ্দিনের মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হয়। মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল মুরাদ। মাঝখানে বসা ছিল সাহিনুদ্দিনের ছেলে মাশরাফি (৭)। পেছনে বসা ছিলেন সাহিন।

মোটরসাইকেল চালিয়ে মুরাদ পল্লবী ‘ডি’ ব্লকের ২৩ নম্বর রোডের সিরামিক গলির উল্টা পাশে এসে থামে। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল সুমন ও মনিরসহ অন্যরা। সাত বছরের ছেলের সামনেই ফিল্মিস্টাইলে মোটরসাইকেল থেকে টেনেহিঁচড়ে সাহিনুদ্দিনকে নামান সুমন। পরে তাকে উপর্যুপরি কোপানো হয়।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, সুমন বাহিনীর সদস্য মনির ও মানিক রামদা দিয়ে সাহিনুদ্দিনকে একের পর এক কুপিয়ে যাচ্ছে। আশপাশ থেকে ভেসে আসছে চিৎকার-কান্না। মাটিতে লুটিয়ে ছটফট করতে করতে বাঁচার আকুতি জানান সাহিনুদ্দিন। সাহিনের হাত-পা, গলা, মুখ, পেট, ঊরু, মাথা, হাঁটুসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলাপাতাড়ি কোপানো হয়।

কিছুক্ষণ কুপিয়ে মানিক চলে গেলেও মনির কুপিয়ে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে গলায় কুপিয়ে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করার পর স্থান ত্যাগ করে মনির।

পল্লবী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী যুগান্তরকে বলেন, সাহিনুদ্দিন ও সুমন দুজনই হ্যাভেলি প্রপার্টিজের পক্ষে কাজ করেন। কিন্তু আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। এই দ্বন্দ্বের জেরেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। হ্যাভেলি প্রপার্টিজের পাশে সাবেক মেজর মোস্তফার একটি প্রকল্প আছে। এই প্রকল্প নিয়ে হ্যাভেলির সঙ্গে মোস্তফার দ্বন্দ্ব ছিল। সাহিনুদ্দিন ও সুমন দুজনই এলাকায় প্রভাবশালী। নিজেদের স্বার্থে হ্যাভেলি ও মোস্তফা দুপক্ষের সঙ্গেই সখ্য রাখতে চাইত তারা। টাকার জন্য প্রায়ই এ দুজন গ্রুপ পরিবর্তন করত। ওসি জানান, একটি মামলায় গ্রেফতারের পর সুমন কয়েক দিন আগে জেল থেকে ছাড়া পায়। এর আগে গত ডিসেম্বরে সুমন বাহিনীর লোকজন সাহিনুদ্দিনকে একবার কুপিয়ে মারাত্মক আহত করে। পরে স্থানীয় আড্ডুর মাধ্যমে তাদের সমঝোতা হয়।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলের পাশেই একটি বাড়িতে সাহিনুদ্দিনের মা বসবাস করেন। তাকে কোপানো শুরু করলে ছেলে মাশরাফি দৌড়ে ওই বাসায় গিয়ে তার দাদি আকলিমাকে বলে, ‘সুমন গুণ্ডা আমার বাবাকে কোপাচ্ছে।’ পরে স্বজনরা এসে সাহিনুদ্দিনের বীভৎস লাশ দেখতে পান।

জানা গেছে, পল্লবীতে দুটি বড় গ্রুপ ছাড়াও এমএ আউয়ালের হ্যাভেলিতে দুটি উপগ্রুপ আছে। একটি উপগ্রুপের নেতৃত্বে আছেন তাহের। অপরটির নেতৃত্বে কিবরিয়া। সুমন তাহেরের গ্রুপ এবং সাহিনুদ্দিন কিবরিয়া গ্রুপকে শেল্টার দিত। অন্যদিকে সাবেক মেজর মোস্তফা কামালের গ্রুপে রয়েছেন সাহিনুদ্দিনের ভাই মাইনুদ্দিন।

সাম্প্রতিক সময়ে সাহিনুদ্দিন হ্যাভেলির পক্ষে এবং মাইনুদ্দিন ছিলেন মোস্তফার পক্ষে। অথচ গত ডিসেম্বরে সাহিনুদ্দিনকে যখন সুমন কোপায়, তখন সাহিনুদ্দিনকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে সহায়তা করেছিলেন মোস্তফা। মোস্তফার কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার পরও সাহিনুদ্দিনের অবস্থান হ্যাভেলির পক্ষে ছিল। সম্প্রতি মোস্তফা সরকারি ৩২ শতাংশ জমি দখল করতে যায়। হ্যাভেলিও তা নিজেদের দাবি করে।

মোস্তফার পক্ষে মাইনুদ্দিন বাউন্ডারি দেয়াল করতে গেলে হ্যাভেলির পক্ষে সাহিনুদ্দিন বাধা দেয়। একপর্যায়ে সুমন ও সাহিনুদ্দিনকে ম্যানেজ করে ফেলে মোস্তফা। এ বিষয়টি হ্যাভেলি জেনে যায়। হত্যাকাণ্ডের পেছনে এই বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।

শেয়ার করুন .....




© 2018 allnewsagency.com      তত্ত্বাবধানে - মোহা: মনিকুল মশিহুর সজীব
Design & Developed BY ThemesBazar.Com