বুধবার, ০৪ অগাস্ট ২০২১, ১২:১৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
বরিশাল হাসপাতালে  টাকা না দেয়ায় মেলেনি অক্সিজেন, ছটফট করে মারা গেলেন রোগী হেলেনা জাহাঙ্গীরের ২ সহযোগী আটক অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা ভ্যাকসিন না নিলে বেতন বন্ধ টিকা বাণিজ্যে অভিযুক্ত ‘হুইপ পোষ্য’কে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত হিলিতে তুলা কারখানায় আগুনে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি গাইবান্ধা গ্রাম পুলিশরা মানহীন সাইকেল গ্রহণে অস্বীকৃতি  অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম জয়ে টাইগারদের প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন জগন্নাথপুরে করোনা উপসর্গে চার ঘণ্টার ব্যবধানে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু ২৬০০ ডোজ টিকা বিক্রি করেন হুইপের ভাই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টি জয় নিয়ে যা বললেন মাহমুদউল্লাহ
শুরুতেই হোঁচট প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্পের

শুরুতেই হোঁচট প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্পের

নিউজ ডেস্ক :

দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সারা দেশ থেকে সব ধরনের রোগী আসেন এ হাসপাতালে। তাই শয্যার চেয়ে দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকে সব সময়। তাদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসক, কর্মকর্তাদের। এই অবস্থার অবসানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই হাসপাতালকে নিয়ে তার স্বপ্নের পরিকল্পনা জানিয়েছেন কর্মকর্তাদের। হাসপাতালটিকে ৫০০০ শয্যায় উন্নীত করে এটিকে দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল এবং আধুনিক চিকিৎসা হাব হিসেবে গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা নিতে বলেছেন। সে অনুযায়ী পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা শুরুতেই হোঁচট খেতে বসেছে এক অদক্ষ ও প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিকল্পনা প্রণয়ন নিয়ে।

 

 

হাসপাতালটিকে ৫ হাজার শয্যায় উন্নীতকরণের জন্য মহাপরিকল্পনার আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ এবং পুনঃনির্মাণ প্রকল্পের নকশা ও সমীক্ষার এই কাজ খুবই ধীর গতিতে এগুচ্ছে। কর্তৃপক্ষের বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও গত প্রায় ১০ মাসে ডিজাইনের কাজ শেষ করতে পারেনি স্থাপত্য প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দি প্রফেশনাল এসোসিয়েট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি কালক্ষেপণ করে কয়েক দফায় সময় বাড়িয়েও নকশা ও সমীক্ষা চূড়ান্ত করতে পারেনি। এর ফলে দিন যতই গড়াচ্ছে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ারও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। চলতি মাসে প্রকল্পের নকশা ও সমীক্ষার কাজ শেষ করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি আবারও আগামী ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির দাবি স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করতে গিয়ে বাড়তি সময় লাগছে।

 

 

এদিকে, নকশা ও সমীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়ায় মহা এই প্রকল্পের মূল কাজে হাত দিতে পারেনি প্রকল্পের পরিচালক। যিনি ঢামেকে হাসপাতালে পরিচালকও বটে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, শিগগিরই নকশা ও সমীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পেলে এ বছরের শেষের দিকে হয়তো মূল কাজে হাত দেয়া সম্ভব হবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে ভবনের নকশা ও অনেকগুলো সমীক্ষার ফলাফলের ওপর।

 

 

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক মানবজমিনকে বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ এবং পুনঃনির্মাণ প্রধানমন্ত্রীর গভীর ইচ্ছার একটি প্রকল্প। এই প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন এবং সমীক্ষার কাজ চলছে। বেশ কয়েকটি সমীক্ষা করতে হবে। জনবল কাঠামোর বিষয়টিও থাকবে। আশা করি খুব শিগগিরই নকশা ও সমীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাবো। নকশা হাতে পেলে হয়তো এ বছরের শেষে মূল কাজ শুরু করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রকল্পের পরিচালক। পরিচালক এমন আশা প্রকাশ করলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে নকশা ও পরিকল্পনা প্রণয়নে দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি এ বছর তাদের চূড়ান্ত পরিকল্পনা জমা দিতে পারবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। কারণ প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে যেসব কাজ করেছে তার কোনোটিই সময়মতো করতে পারেনি। বরং সময় ক্ষেপণ ও অদক্ষতার কারণে কার্যদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের বাদ দিয়ে বিকল্প প্রতিষ্ঠান দিয়ে কাজ করিয়েছে।

 

 

সূত্র জানায়, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দি প্রফেশনাল এসোসিয়েট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা মেডিকেলের কাজের দায়িত্ব পায়। সর্বশেষে গত মাসের ২৩শে তারিখে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ এবং পুনঃনির্মাণ এর জন্য ব্যয় প্রাক্কলনসহ মহাপরিকল্পনা ও ডিজাইন প্রণয়ন’- শীর্ষক প্রকল্পের সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণে একটি সভা আহ্বান করে।

 

কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি এর আগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি বেসরকারি অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জটিলতা তৈরি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এবার প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল নির্মাণ প্রক্রিয়ায়ও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।

 

নকশা প্রণয়নের অংশ হিসেবে সর্বশেষ গত মাসের ১৯ এবং ২৩ তারিখ বৈঠক হয়েছে। সেখানে এই প্রকল্প নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের নির্মাণ অধিশাখা প্রকল্পের স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণে বৈঠক করে তাগাদা দেয়। কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের আবেদনে এখন আগামী ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

 

এদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল আধুনিকায়ন, সমপ্রসারণ এবং পুনঃনির্মাণের জন্য ব্যয় প্রাক্কলনসহ মহাপরিকল্পনা ও ডিজাইন প্রকল্প প্রণয়নে প্রায় ৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সময় বাড়িয়ে মহাপরিকল্পনা ও ডিজাইন জমা দেয়ার শেষ সময় ২৯শে জুন করা হয়।

 

ঢামেক হাসপাতালের আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ এবং পুননির্মাণ প্রকল্পের নকশা ও সমীক্ষার সময় বাড়ানো প্রসঙ্গে-পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দি প্রফেশনাল এসোসিয়েট লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্থপতি মঞ্জুর কে এইচ উদ্দিন এই বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, এই চুক্তিটি অনেক আগেই হয়েছে। প্রকল্পের অনেক স্টেকহোল্ডার রয়েছেন। তাদের সঙ্গে দফায় দফায় মিটিং করতে হয়েছে। নকশার ড্রাফ্‌ট (খসড়ার) কপি এই মাসের ২৯ তারিখে জমা দেয়ার কথা। এটি ২২ তারিখে জমা দেয়া হয়েছে। ফাইনালের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে লাগবে। ৩১ শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি আমি করিরি। স্টিয়ারিং কমিটির অনুমোদনে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

সংশ্লিষ্টরা জানান, এই মেগা প্রকল্প সম্পন্ন করার জন্য ২০১৯ সালে ৭ বছর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। এজন্য ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। ইতিমধ্যে ২ বছর চলে যাচ্ছে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। এর মধ্যে আগের প্রকল্প পরিচালক চলে গেছেন। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক পুরোদমে কাজ করতে বদ্ধপরিকর। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের স্বীকৃতি পাবে পুরনো ঐতিহ্য ও কালের সাক্ষী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

 

সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়। ২০১৬ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি ঢামেক হাসপাতাল সংস্কার ও পুনঃনির্মাণের একটি প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশকিছু অনুশাসন দেন। ২০১৭ সালের শুরু দিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক সভায়ও ঢামেকের আধুনিকীকরণের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের নির্দেশ দেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। আধুনিকীকরণ কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় আধুনিকায়ন কাজের ধীরগতিতে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। হাসপাতালটিকে নতুন করে সাজাতে ১৮তলা ভবন হবে ৫টি। যার প্রতিটি হবে এক হাজার বেডের। আউটডোর কমপ্লেক্স হবে ২টি। থাকবে আলাদা জরুরি বিভাগ। মেডিকেল কলেজটির আধুনিকায়নসহ, নার্সিং কলেজটিকে উন্নীত করা হবে নার্সিং ইনস্টিটিউটে। এর বাইরে মেডিকেল কলেজের আবাসিক হলগুলোকেও তৈরি করা হবে নতুন করে। আর ডিএমসি লাগোয়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের এলাকা প্রশস্ত করতে ছেড়ে দেয়া হবে বেশকিছু জায়গা। মেডিকেল কলেজের মূল ভবনের সম্মুখাংশ অক্ষত রেখে বাকি পুরনো ভবনগুলো পর্যায়ক্রমে ভেঙে ফেলা হবে। পাঁচশ’ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল-২ থেকে যাবে, যেটি নতুন তৈরি হয়েছে। নতুন ভবনগুলোর সঙ্গে মিল রেখে এটির সংস্কার করা হবে। এছাড়া ২০০১ সালে নির্মিত ইমার্জেন্সি কমপ্লেক্সটিও ভাঙা হবে না। তবে ভবনটিকে ১৮তলায় রূপান্তরিত করা হবে। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৬১টি ভবন আছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ তিনটি প্রতিষ্ঠান এ প্রজেক্টের অন্তর্ভুক্ত। প্রকল্পের আওতায় মেডিকেল কলেজের জন্য ১২তলা বিশিষ্ট একটি বিশাল একাডেমিক কমপ্লেক্স হবে। পাশাপাশি নার্সিং কলেজের একটি কমপ্লেক্স হবে। নার্সিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদাভাবে ভবন তৈরি হবে। তবে আগের মতোই একটি প্রতিষ্ঠান আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। শিক্ষার্থীরা আসতে পারে, নার্সরা যেন ওয়ার্ডে ডিউটি করতে পারে- সে ব্যবস্থা থাকবে। এ প্রকল্পের আওতায় এখানে একটি মেডিকেল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন সেন্টার নির্মাণ করা হবে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এ রিসার্চ সেন্টারে মেডিকেল বিষয়ক বিভিন্ন রিসার্চ হবে। এজন্য আলাদা একটি ভবনের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলের ৩০ একর জমির মধ্যে ১১ থেকে ১২ শতাংশ সবুজায়ন এলাকা রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ৫৮ থেকে ৬০ শতাংশ এলাকা সবুজায়নের আওতায় আসবে। চারদিকে সবুজময় স্বাস্থ্যকর একটি পরিবেশ নিশ্চিত হবে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরের ওপর দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া কোনো গাড়ি চলাচল করবে না। সব গাড়ি আন্ডারগ্রাউন্ড দিয়ে চলাচল করবে। গাড়িগুলো বেইজমেন্টে পার্ক করবে। পরে লিফটে সংশ্লিষ্ট বিভাগে চলে যাওয়া যাবে।

 

উল্লেখ্য, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঢামেক হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপও বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গভীর ইচ্ছা অনুযায়ী হাসপাতালের বর্তমান স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে এর সমপ্রসারণ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে নতুন নকশা উপস্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়।

শেয়ার করুন .....




© 2018 allnewsagency.com      তত্ত্বাবধানে - মোহা: মনিকুল মশিহুর সজীব
Design & Developed BY ThemesBazar.Com