শুক্রবার, ১২ অগাস্ট ২০২২, ০৫:৪৩ অপরাহ্ন

 শিক্ষার্থী কতৃক শিক্ষক হত্যা, জাতীয় লজ্জা

 শিক্ষার্থী কতৃক শিক্ষক হত্যা, জাতীয় লজ্জা

লেখকঃ মোঃ হায়দার আলী :

বর্তমান সময়ের কিছু ঘটনা আমাকে খুব ব্যথিত করে তুলেছে। চোখের সামনে এসব ঘটলেও কেন যেন মেনে নিতে কষ্ট হয়। ছোট থেকেই আমি শিক্ষকদের একটু আলাদা শ্রদ্ধামিশ্রিত চোখে দেখতাম। তিনি প্রাইভেট শিক্ষক, মসজিদের মৌলভী কিংবা স্কুল-কলেজ-মাদ্রসার – বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক- যেই হোন কেন তাদের দেখলে, তাদের কথা শুনলে মনের মধ্যে একটা সম্মানবোধ কাজ করত। আমার অনেক বন্ধু, বান্ধবী ছোটভাই, বোন, শিক্ষক আছেন- তাদের প্রতিও আমার শ্রদ্ধার অভাব হয়নি কখনো। সে থেকে আমার শিক্ষক হবার কোন ইচ্ছে ছিল না, চেষ্টা থাকলেও পারিনি হবে ১৯৯২ ইং সালে  ঢাকায়  একটি বেসরকারী ফার্মে প্রকৌশলীর চাকুরী করতাম, গুলমান ২ এ অফিস ছিল সুযোগে সুবিধা ভাল ছিল,  ১৯৯৬ ইং সালে বাবা হজ্ব করতে গেলেন হাজি ক্যাম্পে বাবা সাথে কয়েক দিন নিয়মিত দেখা হলেছিল । এসময় সরকারী প্রকল্পের মাধ্যমে ইংরেজি বিষয়ে ১০০ জন শিক্ষক নিয়োগ দিলেন সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়,  আমি শকের বসে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়োগ পেলাম  রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বেসরকারী স্কুল রাজাবাড়ীহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে। বাবার নির্দেশে চাকুরি ছেড়ে, ঢাকা ত্যাগ করে নিজ এলাকায় সম্মানি পেশায় যোগদান করলাম, পরবর্তীতে ২০১৩ ইং সালে একই উপজেলার  মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। এখনও এখানে কর্মরত আছি। শিক্ষকগণ যেভাবে লাঞ্ছিত,  হয়রানি, হত্যার স্বীকার হচ্ছে তা দেখে এখন মনে হচ্ছে এ পেশায় এসে ভুল করেছি।

আজ আশপাশে হচ্ছেটা কী? বড় বড় শিক্ষালয়ের শিক্ষক, অধ্যক্ষ- যাদের দেখলে আগে শিক্ষার্থীসহ সবাই রাস্তা থেকেই সড়ে দাঁড়াত। অথচ আজ তাদের দিকে আঙুল তুলছে- এমন ভাষায় কথা বলছে; যা মুখে উচ্চারণ করাই যায় না। তবে শিক্ষার্থীরাই খারাপ হয়ে গেল, নাকি শিক্ষক-পণ্ডিতরা আজ তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত? বারবার এমন প্রশ্ন আমার মনে  ঘুরেফিরে আসছে।

মুন্সীগঞ্জের হৃদয় মন্ডলকে প্রাণে শেষ করতে পারেনি কিন্তু আশুলিয়ার উৎপল কুমার সরকারকে হত্যা করতেও শিক্ষার্থীর হাতটি কাঁপেনি। উৎপল কুমার শুধু ভালো শিক্ষক ছিলেন না, তিনি শিক্ষায় শৃঙ্খলা আনতে চেয়েছিলেন। নড়াইলের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। তাকেও লাঞ্ছিত করা হয়েছে। শিক্ষকদের এই লাঞ্ছনা ও হত্যায় যে শুধু ছাত্ররাই জড়িত তা নয়। বোঝা যায় কিছু শিক্ষক, এলাকার ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং অভিভাবকদের একটি অংশও জড়িত থাকতে পারে।
কারণ অনেক, যার মধ্যে আক্রান্ত শিক্ষকদের প্রতি বাকিদের ঈর্ষা এবং কোচিং-বাণিজ্যের সংকটও ধরা পড়ে। ব্যবস্থাপনা কমিটি স্কুলে শৃঙ্খলা চায় না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভালভাবে চলুক এটা তারা চায় না। শিক্ষক নিয়োগে তারা অনিয়ম করতে অভ্যস্ত। অধ্যক্ষ  নিয়োগে ২৫/৩০ লাখ,  উপাধ্যক্ষ নিয়োগে ২০/২৫ লাখ টাকা,  প্রধান শিক্ষক নিয়োগে ১০/১৫ লাখ, সহপ্রধান নিয়োগে ১০/১২ লাখ টাকা টাকা বখরা দিতে হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসাতে অধ্যক্ষ, সুপার নিয়োগে লাখ টাকা ছাড়া নিয়োগ হয় না। লাখ লাখ টাকা ছাড়া নৈশ্যপ্রহরী,  একটা দপ্তরির চাকরিও হয় না। দেশের সর্বব্যাপী দুর্নীতির মধ্যে শিক্ষায় দুর্নীতি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। এই সম্প্রসারণের দিগন্ত মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। তার ওপর রয়েছে এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের একটি বড় অংশের অন্তর্দ্বন্দ্ব।  তিনজন শিক্ষক আক্রান্ত হয়েছেন, এছাড়া এমএলএস (পিয়ন)  কতৃক প্রধান  শিক্ষিকা লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

এদিকে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য সমালোচনায় থাকা ভারতের বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার ছবি দিয়ে এক কলেজ ছাত্রের ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে নড়াইলের ঘটনার সূত্রপাত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত ১৭ জুন সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের ওই ছাত্রের পোস্ট দেওয়ার পরদিন কলেজে গেলে কিছু মুসলমান ছাত্ররা  তাকে ওই পোস্ট মুছে ফেলতে বলেন।
ওই সময় ‘অধ্যক্ষ ওই ছাত্রের পক্ষ নিয়েছেন’ এমন কথা রটানো হলে উত্তেজনা তৈরি হয়। অধ্যক্ষ ও দুজন শিক্ষকের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ গেলে স্থানীয়দের সঙ্গে তাদেরও সংঘর্ষ বাঁধে।
ওই সময় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কলেজের ছাত্র ও স্থানীয়রা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয়। ওই ঘটনার কিছু ছবি ও ভিডিও ফেইসবুকে আসে, যাতে পুলিশের উপস্থিতিও দেখা যায়। সামাজিক মাধ্যম ও দেশের বিভিন্ন স্থানে এর প্রতিবাদ চলছে। প্রশাসনের সামনে এ ঘটনা ঘটায় নড়াইলের ডিসি-এসপিরও বিচার দাবি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “দেখুন অকস্মাৎ অনেক ঘটনা ঘটে যায়, যেগুলো হঠাৎ করেই ঘটে যায়। এই ঘটনায় আমরা সত্যিই দুঃখিত, এ ধরনের একজন শিক্ষককে জুতার মালা পরিয়ে দিয়েছে উত্তেজিত জনতা। আমাদের ডিসি-এসপি তাৎক্ষণিকভাবে যে ব্যবস্থা নিয়েছিল। “সেখানে এত মানুষের উত্তেজনা হয়েছিল, আমরা যা শুনেছি। তারপরও আসল ঘটনাটা কী হয়েছিল সেটা জেনে আপনাদেরকে জানাব বলে সাংবাদিকদের জানিয়ে ছিলেন।

ঘটনাটি খুবই অল্প সময়ের মধ্যে ঘটেছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “মনে হয়েছে, উত্তেজিত জনতা এত বেশি একত্র হয়ে গিয়েছিল, সেখানে ডিসি-এসপির কিছু করার আগেই ঘটনা ঘটে গিয়েছিল। প্রিন্সিপালকে জুতার মালা পরানোর ঘটনা আসলে এটা একটা দুঃখজনক ঘটনা।“
সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “প্রিন্সিপালকে জুতার মালা পরানোর পর আমরা হঠাৎ করেই দেখছি; আমরা ফেইসবুক নামক যন্ত্রে খুব বেশি নিজের কথা, অন্যের কথা প্রচার করে থাকি কিংবা লাইক দিয়ে থাকি। সেখানে আমরা বলব… না জেনে না শুনে- নিজের কথা না বুঝে ফেইসবুকে কোনো উক্তি বা কমেন্টস না করার জন্য আমি পরামর্শ দেব। “ আসাদুজ্জামান খান বলেন, “আমি তো বলেছি, কেউ কোনো দায়িত্ব অবহেলা করলে- পুলিশ করুক কিংবা আমাদের জেলা প্রশাসক করুক কিংবা যেই করুক, কিংবা কোনো জনপ্রতিনিধি করে থাকুক, সেখানে সবাই ছিল, আমি শুনতে পেয়েছি। সেখানে কার কতখানি গাফিলতি রয়েছে, সেই অনুযায়ী আমরা খতিয়ে দেখছি।”

উত্ত্যক্তের ঘটনায় শাসন করায় গত শনিবার সাভারের হাজি ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে (৩৭) স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে তারই প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। দুই দিন পর ওই শিক্ষকের মৃত্যু ঘটে। গত বুধবার ভোরে ওই ছাত্রের বাবা উজ্জ্বল হোসেনকে কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ছাত্রের হাতে শিক্ষক হত্যার এ ঘটনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এটা নিয়ে কী বলব…! যারা আমাদের শিক্ষা দেন তাদেরকে যদি ছাত্র হত্যা করে- তাহলে আমাদের কতখানি নৈতিক অবক্ষয় হয়েছে, আপনারাই চিন্তা করুন!
“তবে আমাদের যেটা করণীয়- সেটা করেছি, আমরা তার বাবাকে ধরেছি, শিগগিরই তাকেও ধরব এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে।”

যে শিক্ষকদের হত্যা ও লাঞ্ছিত করা হয়েছে তারা প্রথমত ভালো শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান করেন এবং ছাত্রদের শিষ্টাচার সম্পর্কে সচেতন এটাই আজ দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। কোথাও যোগ্য লোকদের মূল্যায়ন নেই।
এই প্রবণতা শুরু হয়েছে দেশের চলমান রাজনীতি থেকে। অর্থ ও পেশিশক্তি দেশের যোগ্য লোকদের কর্মহীন করে তুলেছে। আশুলিয়ার দশম শ্রেণির ছাত্রটি তার দুর্ব্যবহার ও পেশিশক্তির ফলে খুব দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই ছেলে একটি কিশোর গ্যাং পরিচালনা করত। তার অভিভাবকরা এ ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি। এলাকার বয়োবৃদ্ধরা ও স্কুলের ছাত্ররা তার ভয়ে কেউ কিছু বলত না। একটা বিষয় লক্ষণীয় যে বাংলাদেশের প্রবীণ সমাজ দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু ওই কিশোরের ওস্তাদরা অর্থাৎ স্থানীয় সরকারের মেম্বার, চেয়ারম্যান এবং এলাকার সংসদ সদস্য তারা দীর্ঘদিন ধরে কেমন করে চুপ করে রইলেন? আজকাল উপজেলা থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আমলাদের খুব দৌরাত্ম্য দেখা যায়। এলাকার ক্ষমতাবান ইউএনও সাহেবই বা কী করলেন? উপজেলার ওসি সাহেবের কাছে তার সোর্সের মাধ্যমে এই গ্যাংপ্রধানের সংবাদ কি পৌঁছায়নি?  সবাই কি ঘুমিয়ে ছিলেন এবং এখনো ঘুমিয়ে আছেন? স্বপন কুমার বিশ্বাসকে লাঞ্ছিত করার ঘটনা জেলা প্রশাসক, এসপি, অ্যাডিশনাল এসপির সামনেই ঘটেছে। সে সময় সেখানে প্রায় দুই থেকে আড়াইশ পুলিশ সদস্যও উপস্থিত ছিলেন। দেশে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের অনেক সংগঠন আছে। অতীতে তাদের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি, বর্তমানেও দেখা যাচ্ছে  সংগঠনগুলোর নেতারা এসব ব্যাপারেও কি ভোটের হিসাব করেন?
আমাদের সন্তানসন্ততিরা এ দেশেরই স্কুল-কলেজে- মাদ্রসায় পড়ালেখা করে। যদিও একটু টাকাওয়ালা প্রভাবশালী আমলা আর এমপি, মন্ত্রীদের সন্তানরা বিদেশে লেখাপড়া করছে, তাই দেশে কী হলো না হলো তা নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা তাদের নেই। ভেসে যাক শিক্ষাব্যবস্থা। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের চাকরির জন্য ষোলো লাখ টাকা পাওয়া যাবে! সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে লাখ লাখ টাকা পাওয়া যাবে! বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিজের আত্মীয়স্বজনের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত আছে। এবং এ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে আবার দেশে ফিরে আসে কিংবা সুইস ব্যাংক তো আছেই। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ভেস্তে যাক, ভেসে যাক শিষ্টাচার তাতে কার কি আসে যায়! দেখা গেল কোণঠাসা হওয়া কিছু আদর্শবাদী শিক্ষক, নাগরিক চেঁচামেচি, অনশন করল তাতে কী ?

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। ছাত্ররা যে কোনো দেশের ভবিষ্যৎ, শিক্ষকরা দেশ গড়ার কারিগর। শিক্ষক নামেই আছে অনেক মর্মকথা : শি-শিষ্টাচার, ক্ষ-ক্ষমাশীল, ক-কর্তব্যপরায়ণ। শিক্ষা হলো আচরণের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন। শিক্ষা এমন একটা প্রক্রিয়া যেখানে শেখার সুবিধা বা জ্ঞান, দক্ষতা, মান, বিশ্বাস এবং অভ্যাস অর্জন করা যায়।   অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা আজ শুধু ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করে। যদিও শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা। পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান যাচাই করা হয়; কিন্তু বর্তমানে পড়াশোনার মাধ্যমে পরীক্ষা পদ্ধতি টেস্ট করা হয়। যেমন কতটুকু পড়া হলে এ প্লাস পাওয়া যাবে বা কী পড়লে পাস করা যাবে। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হারকে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়; কিন্তু দিতে হবে গুণগত এবং কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থাকে।

পৃথিবীতে যত সম্পর্ক আছে, এর মধ্যে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক একটু আলাদা। এর মধ্যে নিহিত থাকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, শাসন ও স্নেহ। এই সম্পর্কের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পায় উপযুক্ত শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। এই মধুর সম্পর্কে কোথায় যেন চিড় ধরেছে। কারণ ছাত্র-শিক্ষকের মাঝে আরও কয়েকটি চরিত্রের সংযোগ আছে। যেমন অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজব্যবস্থা। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে টানাপোড়েনের উৎস বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভিন্ন হতে পারে, তবে প্রাথমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত সাধারণত কোচিং কিংবা টিউশনি দিয়ে শুরু হয়। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী শুধু ক্লাসে বসে শিক্ষকের পড়া বুঝতে পারা বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। কেউ দু-একটা চমকপ্রদ লেকচার ভিডিও করে দিতে পারেন, যা একবার শুনেও অনেকে মনে রাখতে পারবেন। কিন্তু একজন শিক্ষককে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্লাসে পাঠ্যক্রম শেষ করতে হয়, যেখানে উপস্থিত থাকেন অনেক শিক্ষার্থী। তাই দুর্বল ছাত্রছাত্রীদের তাদের অভিভাবক কিংবা শিক্ষকের সহযোগিতা নিতে হয়; কিন্তু যাদের বাবা-মা শিক্ষিত নন কিংবা অফিসে ব্যস্ত থাকেন তাদের ক্লাসের বাইরে শিক্ষকের সহায়তা খুব প্রয়োজন। আমার জানা মতে কোচিং-টিউশনি জাপান, চীন, মালয়েশিয়া এবং আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে প্রচলিত আছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, কিছু শিক্ষক যারা নানান উপায়ে শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ে আসতে বাধ্য করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শিক্ষার্থী ভিন্ন উপায়ে গণিতের সমাধান করলে কেটে দেওয়া অথবা কোনো শিক্ষার্থী নিজ থেকে বাংলা কিংবা ইংরেজিতে রচনা বা অনুচ্ছেদ লিখলে নম্বর কম দেওয়া এবং কোচিংয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন বলে দেওয়া। অথচ শিক্ষকের বা অন্য কারও লেখা নোট মুখস্থ করে পরীক্ষায় লেখা নকলের শামিল। কোচিং নিয়ে মাঝে মাঝে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়, যার প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। তবে এখনও অনেক নিবেদিত শিক্ষকও আছেন, যারা তাদের ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রাণ উজাড় করে জ্ঞানদান করছেন। শিক্ষার্থীদের নিজের মতো লিখতে দিতে হবে; অন্যথায় ভবিষ্যতে তার কাছে থেকে সৃষ্টিশীল কিছু প্রত্যাশা করা যায় না। আজকাল আমরা দেখি, শিক্ষার্থীরা বাংলা বা ইংরেজিতে এ প্লাস পায়; কিন্তু তাদের অনেকেই একটা বাক্য সঠিকভাবে লিখতে পারে না, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাসও করে না। তখন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সবার মাঝে হতাশা নেমে আসে। তবুও আমরা শিক্ষা নিতে পারি না। বিভিন্ন শ্রেণিতে ধর্মীয় এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর পড়াশোনা করে ভালো ফলাফল করে কিন্তু আমাদের অনেকের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা বলতে কিছু নেই।

কবি কাজী কাদের নেওয়াজের লেখা ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতার মতো অবস্থা আর নেই; যদিও ছাত্র-শিক্ষকের নিবিড় সম্পর্ক এবং উপযুক্ত শিক্ষাক্রম আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কার্যকরী পরিবর্তন আনতে পারে। যুগের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করা প্রয়োজন। কিন্তু ঘন ঘন শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন এবং পরিমার্জন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবক সবার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। তবে বিদ্যালয় পর্যায়ে বইয়ের সংখ্যা কমিয়ে মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক এবং প্রতিষ্ঠান সবাইকে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা করে সব প্রতিষ্ঠানে প্রকৃত মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করতে হবে। শিক্ষকদের সঠিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে শিক্ষকের মর্যাদা নিজেদেরই অর্জন করতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের অধ্যয়ন হতে হবে মূল তপস্যা। তাহলে সমাজ তথা দেশ পাবে প্রকৃত শিক্ষিত, দক্ষ, পরিশ্রমী এবং নৈতিকতাসম্পন্ন জনসম্পদ। বাংলাদেশ পরিণত হবে বিশ্বে উন্নত জাতি হিসেবে
ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে সুন্দর এবং নিবীড় সম্পর্ক থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, একজন ছাত্রকে শিক্ষক শুধু একাডেমিক পাঠদানই করেন না, বরং বাস্তবজীবনে অনেক দিক নির্দেশনাও দিয়ে থাকেন। আবহমান কাল থেকেই ছাত্র-শিক্ষকদের এমন নিবিড় সম্পর্ক ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বুঝা যায়, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক আসলে কাক্সিক্ষত অবস্থানে নেই। ছাত্ররা তাঁর শিক্ষকদের সম্মান করবে এবং শিক্ষকরা ছাত্রদের সন্তানের মতো দেখবে এটাই স্বাভাবিক। ছাত্র ভুল করলে শিক্ষক সে ভুল সংশোধন করে দেওয়ার জন্য কৌশলে তাকে বুঝাতে পারে এবং শিক্ষক ভুল করলে ছাত্রছাত্রীরা তাকে ভদ্রভাবে, বিনয়ের সাথে ভুলটা ধরিয়ে দিতে পারে। বাস্তবতা যদি এমনই হতো, তাহলে দেশের স্কুল, কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজকে এমন পরিস্থিতির শিকার হতো না। পাবলিক কিংবা প্রাইভেট অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে শিক্ষকদের হাতে ইনকোর্স, প্রাকটিক্যাল নম্বর থাকে, কখনো শাস্তিস্বরূপ শিক্ষার্থীদের নম্বর কম দেওয়া হয়। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনেক শিক্ষক আছেন যাদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে, টেস্ট পরীক্ষাতে ফেল করিয়ে দেয়া হয়। যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ তারা হয়তো এমন দুর্ভোগের মুখোমুখি বেশি হয়। পক্ষান্তরে, কিছু ছাত্রছাত্রী আছে, যারা সারাক্ষণ আড্ডা এবং অনলালাইনে সময় কাটায়, ঠিকমত লেখাপড়া করে না, তাদের ফেল করিয়ে দিলে আবার শিক্ষকদের উপর চড়াও হয়। যেটি নিয়মবহির্ভূত কাজ। সুতরাং ছাত্র-শিক্ষক সবাই যদি নিয়ম-কানুন ও নীতি-নৈতিকতা মেনে চলে তাহলে, আমরা আবারও সেই সোনালি দিনের আলোয় আলোকিত হবো, সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তাই এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেতন হওয়ার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।

কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অসৎ, কোচিংবাজ প্রাইভেট বাজ শিক্ষক আছেন যারা  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের  বাইরে রুম বাড়া  নিয়ে স্কুল, কলেজ, মাদ্রসা ফাঁকি দেয়ে প্রাইভেট কোটিং বানিজ্যে  ব্যস্ত সময়নপার করেন। ওই সব অসৎ শিক্ষক টিউশনি করে বেতনের কয়েকগুণ বেশী  টাকা আয় করতে পারেন। তখন ওই শিক্ষক ক্লাসে ভালো না পড়িয়ে স্বভাবত লক্ষ্য থাকে কীভাবে কোচিং কিংবা টিউশনি করা যায়। তবে এও সত্যি, ছাত্রের প্রয়োজন না হলেও কিছু অভিভাবক অনেকটা প্রতিযোগিতা করে সন্তানকে কোচিং বা টিউশনিতে নিয়ে যান। শিক্ষকদের বেতন কম, ঈদ বোনাস সিঁকিভাগ, বাড়ীভাড়া ১০০০/ টাকা, চিকিৎসা ভাতা  ৫০০/ টাকা সুযোগ সুবিধা তেমন নেই বললে চলে, বদলীর কোন ব্যবস্থা এখনও চালু হয় নি। উপযুক্ত সম্মানী, বেতন ভাতা না দিলে কোনোদিনই তাদের নিকট হতে সৃষ্টিশীল কিছু প্রত্যাশা করা যাবে না।

বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো থাকে এবং রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর অনুপাতে শিক্ষকের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। সারাদেশে অনেক সরকারি কলেজে একাদশ, দ্বাদশ, ডিগ্রি (পাস), বিএস (অনার্স) এবং এমএ বা এমএসসি কোর্স থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি বিভাগে শিক্ষক আছেন মাত্র ৫ থেকে ১২ জন, যা খুবই অপ্রতুল। অনেক বিভাগে ক্লাস করার মতো জায়গা নেই; কিন্তু ভর্তি করা হচ্ছে অনেক বেশি। এটা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চরম অন্যায় এবং প্রহসনমূলক কাজ। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষায় টাকা ব্যয় হলে এটা খরচ নয় সবচেয়ে উত্তম বিনিয়োগ। তাই সকল বেসরকরী স্কুল। কলেজ মাদ্রাসাকে জাতীয় করন করতে হবে।আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষাব্যবস্থাকে দেখতেন উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে।

সব পর্যায়ে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক আরও অংশগ্রহণমূলক হওয়া উচিত। অনেক সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা অভিভাবকদের কথা শোনেন না। আবার অভিভাবকদের অতি আবদার রক্ষা করাও সম্ভব হয় না। তবে শিক্ষার্থীকে তার শিক্ষককে সবসময় সম্মান করতে হবে, যেমন করতে হয় নিজের বাবা-মাকে। কিছু ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেও নিজের বাবা-মা কিংবা শিক্ষকদের সম্মান করতে পারে না। এটাই যেন প্রতীয়মান হচ্ছে যে, আজকাল আমরা সার্টিফিকেটের জন্য লেখাপড়া করে থাকি। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সব স্তরই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায় ব্যতিক্রম। যেখানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক বিকাশসহ জীবনের প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। কিন্তু আজ এ কী দেখছি। শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে সম্পর্কটা এখন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বন্ধনে আবদ্ধ নেই। সেখানে স্থান করে নিচ্ছে- স্বার্থ, লোভ আর দাম্ভিকতা। এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক বৈরিতায় রূপ নেবে; যা শিক্ষা তথা সমাজের অগ্রগতিতে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে কী আমরা অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাচ্ছি?

লেখক
সভাপতি
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা,
গোদাগাড়ী উপজেলা শাখা

প্রধান শিক্ষক
মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

শেয়ার করুন .....




© 2018 allnewsagency.com      তত্ত্বাবধানে - মোহা: মনিকুল মশিহুর সজীব
Design & Developed BY ThemesBazar.Com